RSS

হিন্দু বাড়িতে তুলসী গাছ থাকে কেন ?

তুলসী (Tulsi/Holy Basil/ thai Krapho) একটি Lamiaceae family এর অন্তর্গত সুগন্ধি বীরুত্‍ জাতীয় উদ্ভিদ যার বৈজ্ঞানিক নাম Ocimum sanctum (sanctum অর্থ পবিত্র স্থান) । হাজার হাজার বছর ধরে সাধারণত কৃষ্ণ ও রাধা তুলসী এই দুই প্রকারে প্রাপ্ত তুলসী হিন্দু গৃহে পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে পূজিত হয়ে আসছে যেহেতু এর পিছনে রয়েছে ধর্মীয় ,পরিবেশগত ও বৈজ্ঞানিক কারণ ।

ধর্মীয় কারণ :ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে তুলসীকে সীতাস্বরূপা ,স্কন্দপুরাণে লক্ষীস্বরূপা,চর্কসংহিতায় বিষ্ণুর ন্যায় ভুমি,পরিবেশ ও আমাদের রক্ষাকারী বলে বিষ্ণুপ্রিয়া ,ঋকবেদে কল্যাণী বলা হয়েছে । স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু তুলসী দেবীকে পবিত্রা বৃন্দা বলে আখ্যায়িত করে এর সেবা করতে বলেছেন।

পরিবেশগত কারণ : পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে তুলসীগাছ একমাত্র উদ্ভিদ যা দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা অক্সিজেন সরবরাহ করে বায়ু বিশুদ্ধ রাখে যেখানে অন্য যেকোন গাছ রাত্রিতে কার্বন ডাই অক্সাইড ত্যাগ করে তাই রাতের বেলাতে তুলসীতলায় শয়ন করাও ব্যক্তির জন্য উপকারী।এছাড়া তুলসীগাছ ভুমি ক্ষয় রোধক এবং তুলসী গাছ লাগালে তা মশা কীটপতঙ্গ ও সাপ থেকে দূরে রাখে।

বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্যগত কারণ:

*তুলসীতেEugenolঅধিক পরিমাণে থাকায় তা Cox-2 Inhibitorরূপে কাজ করে বলে তা ব্যথানাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
*Hypoglycemic drugs এর সাথে তুলসী খেলে তা টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগে দ্রুত গ্লুকোজের মাত্রা কমিয়ে দেয়।
*তেজস্ক্রিয়তার ফেলে ক্ষতিগ্রস্থ কোষসমুহকে মেরামত করে।
*চর্বিজনিত হৃদরোগে এন্টি অক্সিডেন্টের ভুমিকা পালন করে।
*তুলসী একশেরও বেশি Phytochemicals(যেমন oleanolic acid ,beta caryophyllene ইত্যাদি)বহন করে বলে ক্যান্সার চিকিত্‍সায় ব্যবহৃত হয়।
*তুলসীর অ্যালকোহলিক নির্যাস Immune system এর রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করে।
*তুলসী স্নায়ুটনিক ও স্মৃতিবর্ধক।
*শ্বসনতন্ত্রের বিভিন্নরোগ যেমন ব্রঙ্কাইটিস, ইনফ্লুয়েঞ্জা ,হাঁপানি প্রভৃতি রোগের নিরাময়ক।
*সর্দি ,কাশি, জ্বর, বমি, ডায়ারিয়া ,কলেরা , মুখের আলসারসহ চোখের বিভিন্ন রোগে ইহা ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
*দাঁতের রোগে উপশমকারী বলে টুথপেস্ট তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।

http://melbondhon.yours.tv/t1134-topic#3314

 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন জুন 14, 2013 in কালের কণ্ঠ

 

রথের কথকতা

রথযাত্রা আর্যজাতির একটি প্রাচীন ধর্মোৎসব। কিন্তু এখন রথযাত্রা বললে সাধারণত জগন্নাথদেবের রথযাত্রাকেই বোঝায়। কিন্তু একসময় ভারতবর্ষে সৌর, শক্তি, শৈব, বৈষ্ণব, জৈন, বৌদ্ধ সব ধর্ম-সম্প্র্রদায়ের মধ্যে স্ব স্ব উপাস্যদেবের উৎসববিশেষে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হতো।
প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থ ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ এবং পদ্মপুরাণ-এও এ রথযাত্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। পুরুষোত্তম মাহাতো জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার রথ কেমন হবে, সে সম্পর্কে বলা আছে। বিষ্ণুধর্মোত্তরে একই রথে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা—এই মূর্তিত্রয়ের স্থাপন নির্দেশ থাকলেও পুরুষোত্তম মাহাতো ও নীলাদ্রি মহোদয়ের পদ্ধতি অনুসারে পুরীধামে আজ অবধি তিনজনের জন্য তিনটি বৃহৎ রথ প্রস্তুত হয়ে থাকে।
রথযাত্রার প্রচলন ঠিক কোন সময়ে হয়, তা এখনো স্থিরনিশ্চিত হয়নি। কারও কারও মতে, বুদ্ধদেবের জন্মোৎসব উপলক্ষে বৌদ্ধরা যে রথযাত্রা উৎসব করত, তা থেকেই হিন্দু সম্প্রদায়ের রথযাত্রার উৎপত্তি। আবার অনেকে বিশ্বাস করেন, ভারতে প্রতিমাপূজা প্রচলনের সঙ্গে সঙ্গে রথযাত্রার উৎসব প্রচলিত হয়।
উৎকলখণ্ড এবং দেউলতোলা নামক উড়িষ্যার প্রাচীন পুঁথিতে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার ইতিহাস প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে সত্যযুগে অবন্তীনগরী রাজ্যে ইন্দ্র নামে সূর্যবংশীয় এক পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ভগবান বিষ্ণুর এই জগন্নাথরূপী মূর্তির রথযাত্রা শুরু করার স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে রাজা ইন্দ্র পুরীর এই জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ ও রথযাত্রার প্রচলন করেন। একসময়ে ইউরোপেও যে রথযাত্রা প্রচলিত ছিল, তারও প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বৌদ্ধযুগেও জগন্নাথদেবের রথযাত্রার অনুরূপ রথে বুদ্ধদেবের মূর্তি স্থাপন করে রথযাত্রার প্রচলন ছিল। বিখ্যাত চীনা পর্যটক ফা হিয়ান খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতকে তৎকালীন মধ্য এশিয়ার খোটান নামক স্থানে যে বুদ্ধ রথযাত্রার বর্ণনা দিয়েছেন, তা অনেকাংশে পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ত্রিশ ফুট উঁচু চার চাকার একটি রথকে বিভিন্ন রত্ন, অলংকার ও বস্ত্রে সুন্দরভাবে সাজানো হতো। রথটির চারপাশে থাকত নানা দেবদেবীর মূর্তি। মাঝখানে স্থাপন করা হতো বুদ্ধদেবের মূর্তি। এরপর সে দেশের রাজা তাঁর মুকুট খুলে রেখে খালি পায়ে রথের সামনে এসে নতমস্তকে বুদ্ধদেবের উদ্দেশে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার পর মহাসমারোহে রথযাত্রা শুরু হতো। পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রায় আজও আমরা দেখে থাকি যে প্রতিবছর রথযাত্রার উদ্বোধন করেন সেখানকার রাজা। রাজত্ব না থাকলেও বংশপরম্পরাক্রমে পুরীর রাজপরিবারের নিয়মানুযায়ী যিনি রাজা উপাধিপ্রাপ্ত হন, তিনি জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাদেবীর পরপর তিনটি রথের সামনে এসে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান ও সোনার ঝাড়ু দিয়ে রথের সম্মুখভাগ ঝাঁট দেওয়ার পরই পুরীর রথের রশিতে টান পড়ে। শুরু হয় জগন্নাথদেবের রথযাত্রা।
এখনো ভাদ্র মাসের প্রথমেই ইউরোপের অন্তর্গত সিসিলি দ্বীপে রথযাত্রার অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। ওই বিলাতি রথযাত্রা মেরির উদ্দেশে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তবে সূর্য-রথই যে সব রথের প্রথম, তা পুরাণে বলা আছে।
পূর্বে ভারতীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মধ্যে কার্তিক মাসে শ্রীকৃষ্ণের রথযাত্রার অনুষ্ঠান হতো। বৌদ্ধ প্রভাবকালে তা বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। হিন্দুধর্মের পুনরুদ্ভবকালে উৎকলবাসীর মনোরঞ্জনের জন্য সেই সময়েই জগন্নাথদেবের রথযাত্রা প্রচলিত হলো। এই জগন্নাথদেবের রথযাত্রা ক্রমে সর্বত্র প্রচলিত হলে শ্রীকৃষ্ণের রথযাত্রার বিষয় অনেকেই ভুলে গেল। তবে হিমালয়ের কোনো কোনো স্থানে দেবীর রথযাত্রার কথা এখনো শোনা যায়। নেপালে কি বৌদ্ধ, কি শৈব সর্বসাধারণের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকার রথযাত্রা প্রচলিত আছে।
পুরীর রথের কথা তো আমরা সবাই জানি। সেখানে সমুদ্রকেও ছাপিয়ে ওঠে রথের মেলার জনসমুদ্র। মেদিনীপুর জেলার প্রাচীন ঐতিহ্যমণ্ডিত মহিষাদলের রাজপরিবারের বিখ্যাত কাঠের রথ, বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের অতীত গৌরবের সাক্ষী পাথরের রথ। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের প্রতিষ্ঠাত্রী রানি রাসমণি ১৮৩৮ সালে এক লাখ ২২ হাজার টাকা খরচ করে তৈরি করেছিলেন রুপার রথ। মেদিনীপুর জেলার রামগড়ের রাজারা রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ নিয়ে টানতেন পিতলের রথ। কাঁঠালপাড়ার ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের পারিবারিক রথ ছিল টিনের। কাঠের কাঠামোয় পাঁচটি স্বর্ণচূড়ামণ্ডিত রথ আছে মধ্য কলকাতার সুরি লেনে মল্লিক পরিবারের।আর বাংলা ১০৭৯ সালে ৩৪০ বছর আগে তৈরি হয়েছিল ধামরাইয়ের প্রথম রথ। এই রথের প্রতিষ্ঠাতা দেবতা যশোমাধব।
ধামরাই রথযাত্রা সম্পর্কে জানা যায়, বাংলার পাল বংশের শেষ রাজা যশোপাল ছিলেন প্রজাবৎসল ও ধার্মিক। রাজা যশোপাল এই মাধব মূর্তি আবিষ্কার করেন। ঘটনা সূত্রে রাজা যশোপাল একদা হাতিতে আরোহণ করে বেড়াতে যান ধামরাই এলাকার পাশেই অন্য একটি গ্রামে। রাস্তায় চলার সময় একটি মাটির ঢিবির সামনে গেলে হাতিটি থেমে যায়, আর চলতে চায় না। রাজা শত চেষ্টা করেও হাতিটি সামনে নিতে ব্যর্থ হন এবং এটা দেখে তিনি অবাক হলেন। তখন তিনি হাতি থেকে নেমে স্থানীয় লোকজনকে ওই মাটির ঢিবি খনন করতে বললেন। যথা সময়ে খনন কাজ শুরু হলে সেখানে একটি মূর্তি পাওয়া যায়। তার মধ্যে শ্রী বিষ্ণু মূর্তির মতো দেখতে শ্রী মাধবের মূর্তি ছিল। রাজা ভক্তি করে সেটি নিয়ে এসে ধামরাই সদরে ঠাকুরবাড়ির পঞ্চাশ গ্রামের বিশিষ্ট পণ্ডিত শ্রী রাম জীবন রায়কে মাধব মূর্তি প্রতিষ্ঠার ভার দেন।

তখন থেকে শ্রী মাধবের নামের সঙ্গে রাজা যশোপালের নামটি বিগ্রহের নতুন নামকরণ হলো শ্রী শ্রী যশোমাধব। রাজা অমর হয়ে রয়ে গেলেন। সেই দিন থেকে সেবা-পূজা বন্দোবস্ত হলো। আজও ধামরাইয়ের শ্রী মাধব অঙ্গনে পূজা-অর্চনা চলে আসছে। পরে শ্রী মাধবকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে ধামরাইয়ের শ্রী শ্রী যশোমাধবের রথযাত্রা ও মেলা। তাই আজও হাজার হাজার হিন্দুভক্ত উপস্থিত হয়ে তাদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় অনুষ্ঠান রথযাত্রা সম্পাদন করেন। আবার অমৃত মিষ্টি আর জিলাপির গন্ধে মেলার জায়গাটি হয়ে ওঠে সুগন্ধময়।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনারা রথটিকে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়। এখনো বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে রথযাত্রা এবং সে উপলক্ষে মেলা বসে। রাজশাহীতেও রথবাড়ী থেকে প্রতিবছর রথযাত্রার অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। রথযাত্রা শুধু ধর্মীয় উৎসবই নয়, এর সঙ্গে সামাজিক বন্ধনেরও একটা শিক্ষা রয়েছে। সহস্র মানুষের সমবেত শক্তিতে অচল রথ সচল হয়, এই সত্যটা রথযাত্রার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

http://www.prothom-alo.com/detail/date/2013-07-05/news/365278

http://www.priyo.com/2013/07/10/23650.html

 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন জুন 14, 2013 in কালের কণ্ঠ

 

বেদ

ভারতবর্ষের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তো অতুলনীয়। আজ থেকে দু কি তিন হাজার বছর আগেও তো ভারতবর্ষের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিন্দুমাত্র অমলিন ছিল না। বরং আরও সমুজ্জ্বল থাকারই সম্ভাবনা। তখন তো কলকারখানা ছিল না। আকাশ ছিল নীলাভ ও নির্মল। মেঘেরাও। সে সময়ে শীতকালেও খুব বৃষ্টি হত নাকি।
মনে হয়, ভারতবর্ষের প্রাচীন মানুষেরা প্রাকৃতিক শক্তি বা সৌন্দর্য দেখে নিশ্চয়ই অভিভূত হয়েছিল ।
আর ঋষিরা?
ঋষিরা যেহেতু ব্যাতিক্রমী হৃদয়ের অধিকারী, কাজেই তারা সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ বা ভীত হয়ে গিয়ে রচনা করলেন মন্ত্র: যাকে সংস্কৃত ভাষায় বলা হয়, স্তোত্র বা সূক্ত। কাজেই প্রাচীন ভারতের ঋষিরা, সর্বমোট যে ২০,৩৭৯ টি সূক্ত রচনা করেছিলেন তারই সংকলনকে বলা হয় বেদ। কেননা বেদ-এ রয়েছে সর্বমোট ২০,৩৭৯টি মন্ত্র বা ঋক।
প্রাচীন ভারতকে বলা হয় বৈদিক ভারত। ওই বৈদিক কথাটা এসেছে বেদ থেকেই। বৈদিক সমাজে দারুণ প্রভাব ছিল গ্রন্থটির।
সহস্র মন্ত্রের সমষ্টি বলেই বেদ অনির্বায ভাবেই ধর্মীয় গ্রন্থ । প্রাচীন ভারতেই গ্রন্থটি রচিত ও সঙ্কলিত হয়েছিল আজ থেকে ৩ বা সাড়ে ৩ হাজার বছর আগে; গবেষকরা এমনই মনে করেন।
দীর্ঘকাল বেদ বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। পরে বেদ সঙ্কলন করলেন কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস। ইঁনিই রচেছিলেন মহাভারত।
বেদ-এর ভাষা আদি সংস্কৃত। সাধারন মানুষ তো দূরের কথা; অতি শিক্ষিত পন্ডিতেও টীকাভাষ্য বাদে বেদ বোঝে না। সবচে ভালো টীকা নাকি লিখেছেন সায়নাচার্য। জানি না। আমি বেদজ্ঞ নই। তবে বেদ বোঝার জন্য টীকাভাষ্যের দরকার হয়। কেননা, বৈদিক যুগে একই শব্দের বিভিন্ন অর্থ হত। যেমন: “গো” শব্দের অর্থ হতে পারত জল রশ্মি বাক্য পৃথিবী গরু।
মনে করা হয় যে যিশুখ্রিস্টের জন্মের ১৫০০ বছর আগে আর্যরা পারস্য হয়ে প্রাচীন ভারতে এসেছিল প্রাচীন । তার আগেই প্রাচীন ভারতে হরপ্পা ও মহেনজোদারো সভ্যতা প্রায় ধ্বংসের মুখে এসে পৌঁছেছিল। তো, আর্যরা প্রথমে ভারতবর্ষের পশ্চিমাঞ্চলে বসবাস করে; আরও পরে তারা পূবের গাঙ্গেয় অববাহিকা অবধি পৌঁছেছিল।
এভাবেই সূচিত হয়েছিল বৈদিক যুগের।
বৈদিক ঋষিরা বেদ লিখেছিল ভোজ নামে এক ধরনের গাছের পাতার ওপর। এই ভূর্জপত্র বা ভোজ পাতাই হল প্রাচীন ভারতের প্যাপিরাস।
সেই বৈদিক যুগেই গড়ে উঠেছিল বেদ-এর কনসেপ্ট।
তো বেদের কনসেপ্ট বা বিষয় কি?
বেদের কনসেপ্ট বা বিষয় হল দেবতা ও যজ্ঞ।
দেবতা কি তা জানি। কিন্তু, যজ্ঞ কি?
দেবতার উদ্দেশ্যে দ্রব্য ত্যাগই যজ্ঞ।
বৈদিক যজ্ঞে নাকি রাশি রাশি কাঠ, মন মন ঘি পুড়ত। শত শত ছাগ, শত শত ষাঁর রীতিমতো বলি হয়ে যেত।
বেদে নানা দেবতার কথা উল্লেখ রয়েছে। যেমন, অগ্নি ছিলেন বেদ-এর একজন প্রধান দেবতা।অন্য দেবতারা হলেন: বায়ূ জল সূর্য উষা পৃথিবী আকাশ।
আগেই বলেছি, বৈদিক ঋষিরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গিয়ে রচনা করেছিলে স্তোত্র বা সূক্ত বা মন্ত্র। তো, তখনকার সমাজে লোকে বিশ্বাস ছিল যে বিশেষ উপায়ে এসব দেবদের ভজনা করলে সুখশান্তি মেলে; বিপদ ধারেকাছেও ঘেঁষে না, উপরোন্ত ধনবৃদ্ধি হয়। কী করে দেবদের ভজনা করা যায় সে পথ দেখাত বেদ। কাজেই বেদ ছিল বেস্ট সেলার। তবে গ্রন্থটি সবাই পাঠ করতে পারত না। কেবল ব্রাহ্মণরাই এটি পড়তে পারত ব্যাখ্যা করতে পারত; অন্যরা নয়। বৈদিক সমাজে তখন বর্ণপ্রথা ছিল।
বৈদিক সমাজে সবচে নিচে ছিল শূদ্ররা। এরা আসলে ছিল আর্য-পূর্ব ভারতের অধিবাসী। আর্যরা এদের পরাজিত করে দাসে রুপান্তরিত করেছিল। শূদ্ররা বেদ শ্রবণ করলে বা শুনলে নাকি ওদের কানে গরম সিসা ঢেলে দেওয়া হত!
তো বেদ কিন্তু একটি গ্রন্থ নয়। বেদ চারটি। যথা:ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ববেদ। বেদের মধ্যে ঋগ্বেদই প্রচীনতম। এর অধিকাংশ সূক্তেই বিভিন্ন দেবতার বর্ণনা ও প্রশস্তি লিপিবদ্ধ আছে। যজুর্বেদ গদ্যে লেখা এবং এটি দুভাগে বিভক্ত। শুল্ক ও কৃষ্ণ যজুর্বেদ; এতে নানা কাহিনী রয়েছে। যেমন গুরু বৈশম্পায়ণ ও শিষ্য যাজ্ঞবল্ক্যের কাহিনী আমরা যজুর্বেদ-এই পাই। শুল্ক যজুর্বেদ মন্ত্রের সঙ্কলন। আর কৃষ্ণ যজুর্বেদ এ মন্ত্র থাকলেও গল্প রয়েছে। এটিকে ভারতীয় পুরাণের উৎস বলা যেতে পারে। সামবেদ বিভিন্ন ঋষিরচিত সূক্তের সংকলন। এ জন্য এটিকে সামবেদ-সংহিতাও বলা হয়। এটি একটি সঙ্গীত গ্রন্থ। বৈদিক যজ্ঞে যে সঙ্গীতের প্রচলন ছিল তা সামবেদ থেকেই নেওয়া। সামবেদের ৭৫টি মন্ত্র বাদ দিলে বাকি সব সূক্ত ঋগ্বেদ
থেকে নেওয়া। অথর্ববেদ: আগের বেদগুলার বিষয় ছিল কেবল মোক্ষ। অথর্ববেদ-এ মোক্ষ ছাড়াও ধর্ম অর্থ ও কাম বিষয় হিসেবে প্রযুক্ত হয়েছে। তা ছাড়া এটি ভারতীয় আয়ুবের্দ শাস্ত্রেরও উৎস। পাপক্ষয়, শক্রজয় বিষয়ক নানা বশীকরণ মন্ত্র রয়েছে এটিতে । সবচে বিস্ময় যে – অথর্ববেদ-এ রয়েছে আর্য ঐক্যের আহবান। অনার্যদের নিশ্চিহ্ন করার ইঙ্গিত!
প্রতিটি বেদ কয়েকটি মন্ডল বা অধ্যায়ে বিভক্ত। মন্ডলে রয়েছে সূক্ত। প্রতিটি সূক্তে রয়েছে বেশ কটি ঋক বা মন্ত্র। আগেই একবার উল্লেখ করেছি, বেদে সর্বমোট মন্ত্রের বা ঋকের সংখ্যা ২০,৩৭৯।
যা হোক। প্রাচীন বৈদিক সমাজেই বেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠেছিল। যিশুর জন্মের ৬০০/৭০০ বছর আগে বৈদিক সমাচে বেদবিরোধী প্রতিবাদী চিন্তাবিদের জন্ম হল। যেমন: চার্বাক মহাবীর বুদ্ধ। বৈদিকরা এদের বলল নাস্তিক।
পরবর্তীকালে বেদবিরোধীরা ভারতবর্ষে টিকে থাকতে পারেনি। ওদের যথা সময়ে হটিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ভারতবর্ষ থেকে অন্যত্র পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়েছিল বৌদ্ধধর্ম। জৈনধর্ম কেবল ভারতবর্ষে আজও টিকে আছে; কারণ, ধর্মটি নানা বৈদিক আচারপ্রথা গ্রহন করেছিল বহুকাল আগেই। চার্বাক ঋষি কি বলেছেন না বলেছেন সে সব এখন পন্ডিতদের গবেষনার বিষয়। ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষ ওসব নিয়ে মাথা ঘামায় না।
কাজেই সংশয়ীদের হটিয়ে বেদ আবার ফিরে আসে। তাছাড়া বেদভিত্তিক ধর্মের উত্থান হয়েছিল খ্রিস্টীয় ষষ্টসপ্তম শতকে। ব্রাহ্মণ্যবাদী পৌরানিক ধর্মের উত্থান ঘটে তখনই। পৌরানিক ধর্মের ভিত্তি ছিল ভারতবর্ষের সমাজে প্রচলিত পুরাণ। আগেই বলেছিকৃষ্ণ যজুর্বেদ কে ভারতীয় পুরাণের উৎস বলা যেতে পারে।
ভারতীয় সমাজে আজও বেদ-এর প্রাধান্য। তার কারণ বিশেষ উপায়ে দেবতার ভজনা করলে সুখশান্তি মেলে, বিপদ আসে না, ধনবৃদ্ধি হয়-ভারতের সাধারণ মানুষের এরকম বিশ্বাস। বেদের দেবতারা অপসৃত হয়ে গেছে কবে। তবে মূল কনসেপ্টটি আজও অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে- পূজো-অর্চনা করে দেবতাকে সন্তুষ্ট করা। বেদের প্রধানতম দেবতা ছিল অগ্নি ।

http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/28864541

 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন জুন 14, 2013 in কালের কণ্ঠ

 

কৃত্তিবাস ওঝা(রামায়নের বাংলা অনুবাদকারী)

কৃত্তিবাস ওঝা (জন্মঃ আনুমানিক ১৩৮১ বঙ্গাব্দ – মৃত্যুঃ আনুমানিক ১৪৬১ বঙ্গাব্দ) ছিলেন মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের একজন প্রধান কবি। তিনি অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার অন্তর্গত ফুলিয়া গ্রামে বাস করতেন। গৌড়েশ্বরের আদেশে তিনি বাল্মীকি রামায়ণেরসহজবোধ্য বাংলা পদ্যানুবাদ করেছিলেন।]তাঁর অনূদিত রামায়ণ কৃত্তিবাসী রামায়ণ নামে পরিচিত। কৃত্তিবাসী রামায়ণ-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এটি মূল রামায়ণের আক্ষরিক অনুবাদ নয়। কৃত্তিবাস রামায়ণ-বহির্ভূত অনেক গল্প এই অনুবাদে গ্রহণ করেছিলেন। তদুপরি বাংলার সামাজিক রীতিনীতি ও লৌকিক জীবনের নানা অনুষঙ্গের প্রবেশ ঘটিয়ে তিনি সংস্কৃত রামায়ণ উপাখ্যানের বঙ্গীকরণ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, এই কাব্যে “প্রাচীন বাঙালি সমাজই আপনাকে ব্যক্ত করিয়াছে।” বাঙালি সমাজে এই বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়। কয়েক শতাব্দী ধরে বইটি বাংলা ঘরে ঘরে পঠিত। বাঙালি সমাজে এই বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়। কয়েক শতাব্দী ধরে বইটি বাংলা ঘরে ঘরে পঠিত। ১৮০২ সালে উইলিয়াম কেরির প্রচেষ্টায় শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে কৃত্তিবাসী …রামায়ণ প্রথম মুদ্রিত হয়।

কৃত্তিবাসী রামায়ণ-এর কোনো কোনো পুঁথি থেকে “কৃত্তিবাসের আত্মপরিচয়” শীর্ষক একটি অসম্পূর্ণ অধ্যায় পাওয়া যায়। এই অধ্যায় থেকে কবির বংশপরিচয়, ব্যক্তিপরিচিতি ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ে অনেক তথ্যের সন্ধান মেলে। কবির পূর্বপুরুষ নরসিংহ ওঝা ছিলেন পূর্ববঙ্গের বেদানুজ রাজার অমাত্য। তাঁরা ছিলেন “মুখুটি” (মুখোপাধ্যায়) বংশজাত। পারিবারিক শিক্ষকতা বৃত্তির জন্য “উপাধ্যায়” পদবি লোকমুখে বিকৃত হয়ে হয় “ওঝা”। পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নরসিংহ ওঝা নদিয়ায় চলে এসে ফুলিয়া গ্রামে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তাঁর পুত্র গর্ভেশ্বর। গর্ভেশ্বরের পুত্র মুরারি। মুরারির সাত পুত্রের অন্যতম ছিলেন কৃত্তিবাসের পিতা বনমালী। কৃত্তিবাসের মায়ের নাম ছিল মালিনী। কৃত্তিবাসেরা ছিলেন ছয় ভাই। তাঁদের এক বৈমাত্রেয় বোনও ছিল। ভাইদের মধ্যে কৃত্তিবাস ছিলেন জ্যেষ্ঠ ও সর্বাপেক্ষা অধিক গুণবান।
বারো বছর বয়সে কৃত্তিবাস গঙ্গা নদী পার হয়ে উত্তরবঙ্গে গুরুগৃহে বিদ্যাশিক্ষা করতে যান। শিক্ষাশেষে রাজপণ্ডিত হওয়ার অভিপ্রায় নিয়ে গৌড়েশ্বরের রাজসভায় উপস্থিত হন এবং একটি সরস শ্লোকরচনা করে রাজাকে তুষ্ট করেন। রাজা একটি পুষ্পমাল্য দিয়ে কবিকে বরণ করে নেন। রাজা কবির প্রত্যাশা জিজ্ঞাসা করলে, কবি বলেন
“ আর কিছু নাঞি চাই করি পরিহার।
যথা যাই তথায় গৌরবমাত্র সার।। ”
কবির উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে রাজা তাঁকে রামায়ণ রচনার নির্দেশ দেন। রাজার আদেশে কৃত্তিবাস তাঁরশ্রীরাম পাঁচালী রচনা করেন।

http://melbondhon.yours.tv/t1098-topic#3273

 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন জুন 14, 2013 in কালের কণ্ঠ

 

পূজা কেন করা হয় পূজা কাকে করা হয়

সাধকানাং হিতার্থায়ৈ ব্রহ্মণে রূপকল্পনা …

পূজা করা হয় ‘চৈতন্যময়ী’ প্রকৃতিকে। কেন করা হয়? চৈতন্যময়ী প্রকৃতিকে তুষ্ঠ করতেই পূজা করা হয়; যাতে পূজারী/ভক্তের জীবন হয়ে ওঠে আনন্দময়, হয়ে ওঠে কল্যাণময় । কিন্তু, প্রকৃতিকে কেন চৈতন্যময়ী বলে মনে করা হয় ? এ প্রশ্নের উত্তর আমরা একটু পরে খুঁজব। তার আগে বলি যে, বাংলায় ‘পূজার’ ধারণাটি অতি সুপ্রাচীন। প্রায় তিন হাজার বছর আগে প্রাচীন বাংলায় ‘পূজার’ প্রাথমিক ধারণার উন্মষ বলে মনে করা হয়। কেননা, ‘পূজা’ শব্দটি কিন্তু বৈদিক আর্য দের সংস্কৃত ভাষার শব্দ নয়; ‘পূজা’ শব্দটি অস্ট্রিক ভাষার একটি শব্দ। সুপ্রাচীন বাংলার মানুষ কথা বলত ওই অস্ট্রিক ভাষায়।
সেই প্রাগৈতিহাসিক সময়ে সুপ্রাচীন বাংলায় বাস করত কিরাত ও আদি- অস্ট্রাল জাতি । তবে সুপ্রাচীন বঙ্গে কিরাতদের সংখ্যা ছিল কম; এদের চেহারা ছিল মঙ্গোলয়েডদের মত এবং আদি-অস্ট্রালদের সংখ্যা ছিল বেশি; এদের চেহারা ছিল অষ্ট্রেলিয়ার আদি অধিবাসীদের মতন! এরাই ছিল বাঙালির পূর্বপুরুষ; এরাই কথা বলত ‘অষ্ট্রিক’ ভাষায়। ‘পূজা’ শব্দটি সুপ্রাচীন বাংলায় প্রচলিত এই অস্ট্রিক ভাষারই শব্দ। এরাই প্রকৃতিকে ‘চৈতন্যময়ী’ মনে করত। ‘চৈতন্যময়ী’ প্রকৃতিকে পূজা করত।
তা হলে প্রাচীন বাংলার অষ্ট্রিকভাষী কিরাত ও আদি- অস্ট্রাল জাতি ‘চৈতন্যময়ী’ প্রকৃতিকে পূজা করলেও বর্তমানে কালীপূজা এবং শারদীয় দূর্গাপূজার মন্ত্রপাঠ এবং অন্যান্য কৃত্যের ক্ষেত্রে কেন সংস্কৃত ভাষা ব্যবহার করা হয়? বিশেষ করে আমরা দূর্গাপূজার সময় দূর্গাকে ‘বিদ্যা রূপেণ সংস্থিতা’,কিংবা ‘জ্ঞান রূপের সংস্থিতা’ এসব অভিধায় ভূষিতা হতে শুনি। এর কারণ কী।
খুলে বলছি। পন্ডিতদের অনুমান, বৈদিক আর্যরা প্রাচীন বাংলায় এসেছিল পশ্চিম দিক থেকে । সময়টা? ৮০০ থেকে ৬০০ খ্রিস্টপূর্বের মধ্যে। কিরাত ও আদি অস্ট্রালরা অরণ্যচারী শিকারী ছিল বলেই বৈদিক আর্যরা তাদের বলত ‘নিষাদ’ ( এর মানে ‘ব্যাধ’ বা ‘শিকারী’) জাতি । তারপর কি হল? আর্যদের বৈদিক ধর্মীয় বিশ্বাস নিষাদরা গ্রহন করল। এর মানে প্রাচীন বাংলার নিষাদ জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাস, আচার-আচরণ ইত্যাদি বদলে গিয়েছিল। বৈদিক ধর্মশাস্ত্র সংস্কৃত ভাষায় লেখা হয়েছিল বলে এবং সেই প্রাচীন সময়ে জীবনের প্রতিটি স্তরেই ধর্মীয় বিধিনিষেধ প্রবল ছিল বলেই প্রাচীন বাংলার নিষাদরা তাদের নিজস্ব ভাষার বদলে সংস্কত ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
অবশ্য আর্যরাও অনার্য নিষাদদের ধর্মীয় চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়েছির।
অনার্য নিষাদদের আদিম ও স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মবিশ্বাস ছিল সাংখ্য, তন্ত্র এবং যোগ। আর্যরা এই তিনটি মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে ড. আহমদ শরীফ লিখেছেন:

বৈদিক ভাষায় দেশী শব্দ যেমন গৃহীত হয়েছে, তেমনি যোগপদ্ধতিও হয়েছে প্রবিষ্ট। বস্তুত এই দ্বিবিধ প্রভাব ঋগে¦দেও সুপ্রকট। তা ছাড়া দেশী জন্মান্তরবাদ, প্রতিমা পূজা, নারী, পশু ও বৃক্ষ-দেবতার স্বীকৃতি, মন্দিরোপসনা,ধ্যান, কর্মবাদ, মায়াবাদ এবং প্রেততত্ত্ব দেশী মানস প্রসূত। কাজেই যোগ ও তন্ত্র সর্ব ভারতীয় হলেও অষ্ট্রিক,নিষাদ ও ভোট -চীনা কিরাত অধ্যূষিত বাঙলা-আসাম-নেপাল অঞ্চলেই হয়েছিল এসবের বিশেষ বিকাশ। যোগীর দেহশুদ্ধি এবং তান্ত্রিকের ভূতশুদ্ধি মূলত অভিন্ন ও একই লক্ষ্যে নিয়োজিত। বহু ও বিভিন্ন মননের ফলে, কালে ক্রমবিকাশের ধারায় সাংখ্য, যোগ এবং তন্ত্র -তিনটে স্বতন্ত্র দর্শন ও তত্ত্বরূপে প্রতিষ্ঠা পায়। এবং প্রাচীন ভারতের আর আর ঐতিহ্যের মতো এগুলি আর্যশাস্ত্র ও দর্শনের মর্যাদা লাভ করে।(বাঙলা বাঙালি ও বাঙালীত্ব; পৃষ্ঠা,৪১)

আর এভাবেই বৈদিক আর্যদের সংস্কৃত ভাষায় নিষাদদের মাতৃভাষার শব্দও গৃহিত হয়েছিল। যেমন: ‘পূজা’ শব্দটি। ‘পূজা’ শব্দের অর্থ-শ্রদ্ধা। এর কয়েকটি বৈশিষ্ট্য এরকম।

(১ ) প্রাকৃতিক শক্তিকে ‘চৈতন্যময়ী’ বলে মনে করা;
(২) সেই চৈতন্যময়ী শক্তিকে নিষাদের মানবীয় উপলব্দির সীমানায় নিয়ে আসা;
(৩) সেই চৈতন্যময়ী শক্তির সঙ্গে মাতাপিতার সর্ম্পক স্থাপন করা; এবং
(৪) সেই চৈতন্যময়ী শক্তির পূজা করা।

এই ছিল প্রাচীন বাংলার নিষাদদের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং কৃত্য (রিচুয়াল)। তবে পূজা করার আরেকটি কারণ হল: ভক্তি । এই বিষয়টি সহজেই বোঝা যায়। পূজারীর হৃদয়ে ভক্তি না এলে সে পূজারই-বা কি অর্থ? এই কথাটা আমরা সহজেই উপলব্দি করতে পারি। ভক্তির উন্মেষ যে সুপ্রাচীন বাংলার নিষাদসমাজেই হয়ে এটি আমরা অনুমান করতে পারি।
কিন্তু, নিষাদরা প্রকৃতিকে কেন ‘চৈতন্যময়ী’ বলে মনে করেছিল ?
নিষাদদের কৌম (গোত্রীয়) সমাজটির গড়ন ছিল মাতৃতান্ত্রিক। সমাজবিকাশের অনিবার্য নিয়মে প্রথমে নিষাদসমাজ ছিল শিকারী ও খাদ্যসংগ্রকারী। তারা বাংলার প্রাচীন অরণ্যে ফলমূল কুড়োত। পরে হাতিয়ারের উন্নতি হল; তারা বনভুমি কেটে জমি চাষ করতে থাকে। এভাবে ওদের কৃষিজীবনে উত্তরণ ঘটে । তবে অনুন্নত হাতিয়ারের (টুলস) কারণে কৃষিজীবন ছিল ভারি অনিশ্চিত। ওদিকে গোত্রের জনসংখ্যা ক্রমেই বাড়ছিল। কাজেই প্রকৃতির কৃপার ওপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় কী! সেই আদিম নিষাদসমাজটি মাতৃতান্ত্রিক ছিল বলেই প্রকৃতিকে তারা ‘চৈতন্যময়ী’ ভেবেছিল। তারা নারীকে জগতের আদি কারণ বলেও ভাবল । কাজেই অদৃশ্য প্রকৃতিক শক্তিটি ওদের আদিম মনে একজন দেবী হিসেবে প্রকাশ পেলেন, দেবতা হিসেবে নন। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে আর্যরা ভারতবর্ষে আসার পূর্বে শিব ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রধানতম অনার্য দেবতা। একইভাবে, প্রাচীন বাংলাতেও আর্যরা আসার পূর্বে শিব ছিলেন প্রধানতম অনার্য দেবতা। যে কারণে প্রকৃতিকে দেবী কল্পনা করলেও শিব এর গুরুত্ব কখনওই হ্রাস পায়নি। আজও …
সে যাই হোক। বাঙালিসমাজে পরবর্তীকালে দেবী ধারণার স্বতঃস্ফূর্ত বিবর্তন দেখতে পাই, যে দেবী ধারণার উন্মেষ ঘটেছিল সুপ্রাচীন বাংলায় নিষাদদের মাতৃতান্ত্রিক ধর্মীয় ভাবনায়। এই দেবী বাঙালিসমাজে ‘শক্তি’ দেবী নামে পরিচিতা। যারা শক্তি দেবীর উপাসনা করেন তারাই ‘শাক্ত’ বলে পরিচিত।ধর্মতত্ত্বের ভাষায়: শাক্ত-তান্ত্রিক। শক্তিদেবী অবশ্য বাঙালিসমাজে আরও নানা নামে পরিচিতা। যেমন: কালী, কামেশ্বরী, ভীমাদেবী, জগদ্বাত্রী, গন্ধেশ্বরী, অন্নপূর্ণা, বাসুলি, বিপদনাশিনী, সন্তোষীমাতা এবং দূর্গা।
এই যে প্রকৃতিকে দেবীরূপে ভজনা- এই বিশ্বাস, সাধনা, দর্শন ও আরাধনার সমস্ত প্রক্রিয়াকে আমরা একত্রে বলতে পারি- ‘তন্ত্র’। যে তান্ত্রিক বিশ্বাসের উন্মেষ হয়েছিল নিষাদদের ধর্মীয় চেতনায় । কাজেই তন্ত্রের উদ্ভব প্রাচীন বাংলায়। ( দেখুন; তন্ত্র: দুলাল ভৌমিক। বাংলাপিডিয়া)
আলোচনার এ পর্যায়ে এবার একবার মূল প্রশ্নে ফিরে যাওয়া যাক। পূজা কাকে করা হয়? এবং কেন করা হয়? পূজা করা হয় ‘চৈতন্যময়ী’ প্রকৃতিকে। কেন করা হয়? চৈতন্যময়ী প্রকৃতিকে তুষ্ঠ করতেই পূজা করা হয়; যাতে পূজারী/ভক্তের জীবন আনন্দময়, কল্যাণময় হয়ে ওঠে। তন্ত্র হচ্ছে দর্শন বা তত্ত্ব। আর পূজা হচ্ছে পদ্ধতি। পূজার উপচার বা উপকরণ নিষাদরা তাদের নিজস্ব পরিবেশ থেকেই সংগ্রহ করেছিল। পরবর্তীকালে বাংলায় তাদের এই ধারণার (প্রকৃতি কে ‘চৈতন্যময়ী’ বলে মনে করে দেবীরূপে ভজনা করা) বিবর্তিত হয়েছিল। এবং এই নারীকেন্দ্রিক তান্ত্রিক ধারণাটি পল্লবিত হয়েছিল। তন্ত্র সর্ম্পকে একটি ইউরোপিয় সূত্র লিখেছে,

The word “tantra” is derived from the combination of two words “tattva” and “mantra”. “Tattva” means the science of cosmic principles, while “mantra” refers to the science of mystic sound and vibrations. Tantra therefore is the application of cosmic sciences with a view to attain spiritual ascendancy. In another sense, tantra also means the scripture by which the light of knowledge is spread .

তন্ত্রের প্রধান একটি সিদ্ধান্তই হল এই যে প্রাকৃতিক শক্তিকে চৈতন্যময়ী মনে করা। কিন্তু, শক্তি কি? বিশ্বজগতে সবই তো শক্তির সমাহার। যে শক্তিকে বিজ্ঞান নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়। আধুনিক সভ্যতা এই মূলতত্ত্বের ওপরই প্রতিষ্ঠিত। প্রকৃতির সূত্র আবিস্কার করে এই শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা কতটা যৌক্তিক এই প্রশ্নও তো আজকাল উঠছে । এই দৃষ্টিভঙ্গি হটকারী কিনা, পরিবেশ বিপর্যয়ের মূলে এই দর্শন সক্রিয় কিনা- এসব প্রশ্নও নিয়েও তো আমরা আজ উদ্বিগ্ন।
তো, প্রাকৃতিক শক্তির নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে তন্ত্রের সিদ্ধান্ত কি?
তন্ত্র প্রাকৃতিক শক্তির নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না। তার কারণ, তন্ত্র প্রাকৃতিক শক্তিকে চৈতন্যময়ী জেনেছে, মা বলে জেনেছে, মায়ের দেবীপ্রতিমা কল্পনা করেছে; দেবী মা (প্রাকৃতি কে) কে একজন তান্ত্রিক নিষ্ঠাভরে ভজনা করতে চায়, আরাধনা করতে চায়, পূজা করতে চায়। পাশাপাশি একজন তান্ত্রিক মনে করেন, একজন ভক্ত চৈতন্যময়ী শক্তির অনুগত থাকলে চৈতন্যময়ী শক্তির কৃপায় তার অশেষ কল্যাণ সাধিত হতে পারে।
এই হল বিজ্ঞান এবং তন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য।
চৈতন্যময়ী প্রকৃতিরূপী নারীবাদী তন্ত্রের দেবী দূর্গা- কালী- বাসুলী – তারা- শিবানী। কিন্তু তন্ত্রের কেন্দ্রে রয়েছেন (আমি আগেই একবার ইঙ্গিত দিয়েছি) অনার্য দেবতা শিব। তন্ত্রমতে শিব তাঁর শক্তি পেয়েছে কালীর কাছ থেকে। আবার শিব- এর রয়েছে পৃথক নিজস্ব শক্তি। তন্ত্রমতে পুরুষ শক্তিলাভ করে নারীশক্তি থেকে। শিব শক্তি লাভ করেছেন তাঁর নারীশক্তির প্রকাশ- গৌড়ীর শক্তি থেকে। তবে শিবের নিজস্ব শক্তিও স্বীকৃত। তন্ত্রসাধনার মূল উদ্দেশ্যই হল- (প্রাকৃতিক) শক্তি দেবীর সাধনা করে “শিবত্ব” লাভ তথা শক্তিমান হওয়া।
এখানেই বলে রাখি যে- প্রাচীন ও মধ্যযুগের বঙ্গবাসী পরবর্তীকালে নগর গড়ে তুললেও সে তার আদিম পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য কখনও পরিত্যাগ করেনি কিংবা বিস্মৃত হয়নি। এই বাঙালি মননের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। নগরেও পূজা হয়েছে। উপচার হল পূজার উপকরণ। এমন কী, পূজার উপচারেও দেখা যায় নিষাদ উপকরণ। আপত চাল, তিল, জল, দুধ, কুশাগ্র, দই, যব, শ্বেতসরিষা, চন্দন, বিল্বপত্র বা বেলপাতা, কচু, হরিদ্রা, জয়ন্তী, ডালিম, বেল, অশোক, মানকচু, ধান, কলাগাছ, গম, মাষকলাই, তিসি। এ সবই প্রাচীন বাংলার লোকজসমাজের কৃষিপণ্য।
এখানেই বলে রাখি যে প্রাচীন বাংলার নিষাদসমাজের তান্ত্রিক বিশ্বাস ও বাহিরাগত (আর্যরা প্রাচীন বাংলার বাইরে থেকে এসেছিল বলে) আর্যবৈদিক মতের কিছু পার্থক্য রয়েছে। বহিরাগত আর্যদের বৈদিক ধর্মবিশ্বাসটি মূলত পুরুষতান্ত্রিক; পক্ষান্তরে বাংলার অনার্যদের তান্ত্রিক মত মাতৃতান্ত্রিক। তা ছাড়া
আর্যদের বৈদিক মত হল ঋষিজ: তার মানে দার্শনিক বা ফিলোফফিক্যাল। এ কারণে মানবকল্যাণে এর ভূমিকা প্রত্যক্ষ নয়, পরোক্ষ। অন্যদিকে তান্ত্রিকমত মুণিজ বা বিজ্ঞান ভিত্তিক হওয়ায় জগৎসংসারে জীবজগতে এর প্রভাব প্রত্যক্ষ। সনাতনধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিধান্ত হল- দর্শনের সামগ্রিক দৃষ্টি এবং তন্ত্রমতের খন্ডিত বা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি একত্রিত হলেই জ্ঞান সম্পূর্ণ হয়। এ কারণেই বেদের যজ্ঞ এবং তন্ত্রের পূজা সম্মিলিত ভাবে সনাতনধর্মকে একটি দৃঢ় ভিত্তি দিয়েছে। (দেখুন;রণজিৎ কর; সনাতনধর্ম: মত ও মতান্তর।)
তন্ত্র থেকে তত্ত্ব। তন্ত্রের বৈশিষ্ট্য বা উদ্দেশ্য হল তত্ত্বের সিদ্ধান্তকে জীবনের কর্মক্ষেত্রে রূপদান করা। কাজেই তন্ত্রের প্রচারের মাধ্যম আচরণ বা থিউরি নয়, প্র্যাকটিস। তন্ত্রমতে নারী জগতের আদি কারণ। তন্ত্রের উদ্ভব প্রাচীন বাংলার মাতৃতান্ত্রিক নিষাদসমাজে হয়েছিল বলেই এমনটাই ভাবা অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল।
কিন্তু, তন্ত্রমতে কেন নারী জগতের আদি কারণ?
ঈশ্বর নিরাকার। রূপহীন। যে কারণে প্রাচীন বৈদিক আর্যরা ঈশ্বরের রূপ বর্ণনা করেছেন এভাবে-

‘রূপংরূপ বিবর্জিতস্য ভবতো ধ্যানেন যদবর্ণিতং।’

এর মানে হল- ‘হে রূপহীন ঈশ্বর! ধ্যানে তোমার রূপ বর্ণনা করেছি।’
তন্ত্রমতে নারী জগতের আদি কারণ এই জন্য যে এই নিরাকার রূপহীন ইশ্বরকে যখন নারী ভাবা হয় তখন ঈশ্বরের মাহাত্ম ক্ষুন্ন হয় না। কাজেই ভক্তের মানসিক প্রবনার ওপরই মাতৃমূর্তির কল্পনা। যে কারণে বলা হয়েছে -

‘সাধকানাং হিতার্থায়ৈ ব্রহ্মণে রূপকল্পনা’

এর মানে হল- ‘সাধকের হিতের জন্য ঈশ্বরের রূপ কল্পনা করা হয়েছে।’

সুপ্রাচীন বাংলার গুরুত্বপূর্ন এক অনার্য ধর্মীয় বিশ্বাস হল- যোগ ( যাকে আমরা ইয়োগা বলে জানি)। পূজার সঙ্গে যোগ-এর অত্যন্ত ঘনিষ্ট সর্ম্পক রয়েছে। এই বিষয়টিও আমাদের জানতে হবে। নইলে পূজা কেন করা হয়, এবং কাকে করা হয় এসব নিগুঢ় বিষয় পরিস্কার হবে না ।
আমরা জেনেছি যে তন্ত্র নারীবাদী হলেও এর কেন্দ্রে রয়েছেন শিব ; যিনি প্রধানতম অনার্য দেবতা। এবং তন্ত্রে নারীকে জগতের আদিকারণ মনে করা হলেও বিশ্বপ্রকৃতির সমস্ত শক্তির উৎস হলেন শিব। আর এই কারণেই তো, কাজী নজরুল ইসলাম আহিরি ভৈরব রাগে রচিত তাঁর বিখ্যাত ‘অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারি’ গানটিতে শিব কে ‘ত্রিভূনের পতি’ বলে উল্লেখ করেছেন-

‘নবমেঘ চন্দনে ঢাকি অঙ্গজ্যোতি/
প্রিয় হয়ে দেখা দাও ত্রিভূবন পতি
বিষাণ ফেলিয়া হও বাঁশরীধারী …

উত্তর ভারতে শিব সম্বন্ধে বলা হয়েছে-‘সত্যম’,‘শিবম’,‘সুন্দরম’। এ সমস্ত কারণে যোগ- এর উদ্দেশ্যই হল ‘শিবত্ব’ অর্জন। মধ্যযুগের বাংলায় চন্দ্রদ্বীপবাসী (বরিশালের) মীননাথ শিবপন্থি নাথধর্ম প্রচার করেছিলেন । মীননাথ-এর শিষ্যদের বলা হয় নাথযোগী। নাথযোগীরা সাহিত্যকে আশ্রয় করে তাদের ধর্ম-দর্শন প্রচার করেছিলেন। এদের লেখা কাব্য বাংলা সাহিত্যের অমূল্য রতœ বলে বিবেচিত। নাথযোগীদের লেখা ‘গোরক্ষ বিজয়’-এ লেখা রয়েছে-

‘মুন্ডে আর হাড়ে তুমি কেনে পৈর মালা
ঝলমল করে গায়ে ভস্ম ঝুলি ছালা।
পুনরপি যোগী হৈব কর্ণে কড়ি দিয়া।’

এই চারটি চরণে আসলে একজন যোগীর ছবিই আঁকা হয়েছে। যোগীর ছবিটি আসলে অনার্য শিবেরই ছবি। এবং কড়ি জিনিসটা অস্ট্রিকভাষী নিষাদ/ কিরাতের উপচার (উপকরণ)। এবার তাহলে বলি যোগ- এর সঙ্গে চৈতন্যময়ী মা-প্রকৃতির কী সর্ম্পক। যোগীগণ শরীরের চৈতন্যকেই প্রাণশক্তি বা আত্মা বলে মনে করতেন। দেহের বাইরে চৈতন্য যেহেতু সম্ভবপর নয়; সুতরাং, শরীর সম্বন্ধেই অনার্য যোগীঋষিরা সুপ্রাচীনকালে কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলেন। (পাঠক, এই সুপ্রাচীন ভাবনাকে বাউল দর্শনেরও ভিত্তি বলে মনে করতে পারেন কিন্তু) দেহকে বোঝা ও একে নিয়ন্ত্রন করে ইচ্ছে মতন পরিচালিত করা যোগসাধনার অন্যতম লক্ষ্য। ‘কায়া’ মানে শরীর। ‘কায়সাধন’ মানে শরীরের সাধনা।‘ কায়সাধন অতি প্রাচীন দেশী শাস্ত্র, তত্ত্ব ও পদ্ধতি।’(বাঙলা বাঙালি ও বাঙালীত্ব: আহমদ শরীফ; পৃষ্ঠা ৪৩) এ ছাড়া শরীর বিষয়ক বাঙালির ধর্মতত্ত্বের একটি বড় সিদ্ধান্ত এই -

‘ব্রহ্মান্ডে য গুণাঃ সন্তি তে তিষ্টন্তি কলেবরে’।

এর মানে, ‘যা আছে ভান্ডে (মানে শরীরে/মানবদেহে) তাই আছে বিশ্বভ্রহ্মান্ডে বা ইউনিভার্সে ।’ ড.আহমদ শরীফ একবার মন্তব্য করেছিলেন: ‘বাঙালির ধর্মতত্ত্বে পাপ-পুন্যের কথা বেশি নেই। অনেক বেশি রয়েছে জীবন রহস্য জানবার বুঝবার প্রয়াস।’ (বাঙলা বাঙালি ও বাঙালীত্ব: আহমদ শরীফ পৃষ্ঠা; ৪৮) পন্ডিতের এ কথা একালেও যেমন সত্য সেই আদিম নিষাদ-যুগেও সত্য।
… বলেছিলাম তন্ত্রের একটি বিরাট সিদ্ধান্ত হল শক্তিকে চৈতন্যময়ী মনে করা। সেই চৈতন্যময়ী শক্তি কি কেবল প্রকৃতিতেই বিরাজ করে?
না। চৈতন্যময়ী শক্তি সর্বত্র বিরাজমান।
মানবদেহে?
অবশ্যই।
প্রাচীন বাংলার বাঙালি যোগীগণ শরীরের ভিতর যে চৈতন্যকেই প্রাণশক্তি বা আত্মা মনে করেন তিনিই সেই চৈতন্যময়ী । এই মানবচৈতন্য সেই শক্তিরই এক রূপ। দেহের বাইরে চৈতন্য সম্ভব নয় বলেই জীবন রহস্য জানবার বুঝবার প্রয়াস প্রাচীন বাংলার বাঙালি যোগীগণ শরীর সম্বন্ধে কৌতূহলী হয়েছে এবং এভাবে সুপ্রাচীন কালেই বাউল দর্শনের ভিত্তি স্থাপন করেছেন। ছান্দোগ্য উপনিষদেও এর সমর্থন

‘এই পৃথিবীতে দেহেরই পূজা করিবে, দেহেরই পরিচর্যা করিবে। দেহকে মহীয়ান করিলে এবং দেহের পরিচর্যা করিলেই ইহলোক ও পরলোক-এই উভয়লোকই লাভ করা যায়। (বিরোচন। ৮/৮/৪)

এবার বলি তন্ত্রমতে পূজার আধার ১১ টি। এসব আধার পূজারীর দেহের সঙ্গে সর্ম্পকযুক্ত। দেবীপ্রতিমা, প্রজ্জ্বলিত অগ্নি, পাত্রস্থিত জল, চিহ্নিত যন্ত্র, মন্দির পরিচায়ক ছবি অংকিত বিশেষ চিহ্ন (সাত্ত্বিক চিহ্ন, ঔঁ কার চিহ্ন) মস্তক শিরোদেশ এবং পূজারীর হৃদয়।
পূজায় দুটি বিষয় রয়েছে। এক মন্ত্র ও উপচার। একটি অন্তরের দিক ও অন্যটি বাহ্যিক দিক। মন্ত্র অন্তরের দিক, উপচার বাহ্যিক দিক। উপচার হল পূজার উপকরণ। আশ্চর্য এই যে -পূজার উপচারও দেহের সঙ্গে গভীরভাবে সর্ম্পকিত। পূজায় প্রধান হল পঞ্চোপচার। যেমন সুগন্ধ দ্রব্য, পানীয়, প্রদীপ, পাখার বাতাস ও ফুল। এসবের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য। আসলে পঞ্চোপচার হল পূজারী দেহের প্রাণের মনের বেদনের ও অহং এর প্রতীক যা দেবীর নিকট নিবেদন করা হয়। এর মানে পূজারী তার বস্তুময় জীবনক্ষেত্র, প্রাণময় জীবনক্ষেত্র, মনোময় জীবনক্ষেত্র, বোধময় জীবনক্ষেত্র এবং আনন্দময় জীবনক্ষেত্র প্রতীক হিসেবে দেবীর কাছে নিবেদন করলেন। এর নামই আত্ম নিবেদন। এভাবে উপাসক মানুষ তার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করল।
এ পোস্টের গোড়ায় এই দুটি প্রশ্ন ছিল যে পূজা কাকে করা হয়? পূজা কেন করা হয়?
বাঙালি হিন্দু তান্ত্রিক বলেই পূজা করে; বাঙালি হিন্দুর ঐতিহ্যে যোগসাধনার ভূমিকা রয়েছে বলেই তারা পূজা করে। বাঙালি হিন্দু তান্ত্রিক বলেই প্রাকৃতিক শক্তিকে চৈতন্যময়ী মনে করে। এবং সেই চৈতন্যময়ী শক্তিকে বাঙালি হিন্দুর মানবীয় উপলব্দির সীমানায় নিয়ে এসে সেই চৈতন্যময়ী শক্তির সঙ্গে মাতাপিতার সর্ম্পক স্থাপন করে, সেই চৈতন্যময়ী শক্তিকে দেবীরূপে কল্পনা করে পূজা করে। অষ্ট্রিক ভাষার শব্দ ‘পূজা’ অর্থ-শ্রদ্ধা …

এই পোস্টটির তথ্যের উৎস:

আহমদ শরীফ; বাঙলা বাঙালি ও বাঙালীত্ব।
নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য; ধর্ম ও সংস্কৃতি; প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট
ড. এম আর দেবনাথ; সিন্ধু থেকে হিন্দু ।
রণজিৎ কর; সনাতনধর্ম: মত ও মতান্তর।

http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29697789

 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন জুন 14, 2013 in কালের কণ্ঠ

 

অমর সাহিত্যঃ মহা ভারত

পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন একটি সাহিত্যকর্ম হিসাবে মহা ভারত পৃথিবী বিখ্যাত। একটা সাহিত্য কর্ম মানুষের উপর কতটা প্রভাব ফেললে সেটা ধর্ম গ্রন্থে পরিনত হয় তার একটি জলন্ত প্রমান এই মহা ভারত। আজ এই অমর সাহিত্য সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।
মহাভারত (সংস্কৃত: महाभारत) সংস্কৃত ভাষায় রচিত প্রাচীন ভারতের দুটি প্রধান মহাকাব্যের অন্যতম (অপরটি হল রামায়ণ)। এই মহাকাব্যটি হিন্দুশাস্ত্রের ইতিহাস অংশের অন্তর্গত।
মহাভারত-এর মূল উপজীব্য বিষয় হল কৌরব ও পাণ্ডবদের গৃহবিবাদ এবং কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পূর্বাপর ঘটনাবলি। তবে এই আখ্যানভাগের বাইরেও দর্শন ও ভক্তির অধিকাংশ উপাদানই এই মহাকাব্যে সংযোজিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ – এই চার পুরুষার্থ-সংক্রান্ত একটি আলোচনা (১২।১৬১) সংযোজিত হয়েছে এই গ্রন্থে। মহাভারত-এর অন্তর্গত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রচনা ও উপাখ্যানগুলি হল ভগবদ্গীতা, দময়ন্তীর উপাখ্যান, রামায়ণ-এর একটি সংক্ষিপ্ত পাঠান্তর ইত্যাদি। এগুলিকে মহাভারত-রচয়িতার নিজস্ব সৃষ্টি বলে মনে করা হয়।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, মহাভারত-এর রচয়িতা ব্যাসদেব। অনেক গবেষক এই মহাকাব্যের ঐতিহাসিক বিকাশ ও রচনাকালীন স্তরগুলি নিয়ে গবেষণা করেছেন। অধুনা প্রাপ্ত পাঠটির প্রাচীনতম অংশটি মোটামুটি ৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ রচিত হয়। মহাভারতের মূলপাঠটি তার বর্তমান রূপটি পরিগ্রহ করে গুপ্তযুগের প্রথমাংশে (খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দী)। মহাভারত কথাটির অর্থ হল ভরত বংশের মহান উপাখ্যান। গ্রন্থেই উল্লিখিত হয়েছে যে ভারত নামে ২৪,০০০ শ্লোকবিশিষ্ট একটি ক্ষুদ্রতর আখ্যান থেকে মহাভারত মহাকাব্যের কাহিনিটি বিস্তার লাভ করে।

মহাভারত-এ এক লক্ষ শ্লোক ও দীর্ঘ গদ্যাংশ রয়েছে। এই মহাকাব্যের শব্দসংখ্যা প্রায় আঠারো লক্ষ। মহাভারত মহাকাব্যটির আয়তন ইলিয়াড ও ওডিসি কাব্যদ্বয়ের সম্মিলিত আয়তনের দশগুণ এবং রামায়ণ-এর চারগুণ।

রচনার ইতিহাস ও গঠনঃ

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ব্যাসদেব এই মহাকাব্যের রচয়িতা। তিনি এই আখ্যানকাব্যের অন্যতম চরিত্রও বটে। মহাভারত-এর প্রথম অংশের বর্ণনা অনুযায়ী, ব্যাসদেবের অনুরোধে তাঁর নির্দেশনা মতো গণেশ এই মহাকাব্য লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব নেন। গণেশ একটি শর্তে এই কাজে রাজি হয়েছিলেন। তাঁর শর্ত ছিল ব্যাস একবারও না থেমে সমগ্র মহাকাব্যটি আবৃত্তি করবেন। ব্যাস রাজি হন, কিন্তু তিনিও পাল্টা শর্ত দেন যে গণেশও প্রতিটি শ্লোকের অর্থ না বুঝে লিপিবদ্ধ করতে পারবেন না।

মহাভারত মহাকাব্যটি গল্পের মধ্য গল্প শৈলীতে রচিত। এই শৈলী ভারতের অনেক ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ রচনার বৈশিষ্ট্য। অর্জুনের প্রপৌত্র জনমেজয়ের নিকট এই কাহিনি পাঠ করে শোনান ব্যাসদেবের শিষ্য বৈশম্পায়ন। অনেক বছর পরে, জনমেজয়ের নিকট বৈশম্পায়নের এই মহাভারত কথনের ঘটনাটি পেশাদার কথক উগ্রশ্রবা সৌতি কর্তৃক ঋষিদের একটি যজ্ঞসমাবেশে কথিত হয়।

সংক্ষিপ্ত কাহিনিঃ

কাহিনীর শুরু প্রকৃতপক্ষে ভরত রাজার সময় থেকে। কিন্তু বহু পুস্তকে রাজা শান্তনুর সময় থেকে কাহিনী শুরু করা হয়। পিতৃসত্য পালনের জন্য শান্তনুর পুত্র দেবব্রত আজীবন বিবাহ করেন নি ও রাজসিংহাসনে বসেন নি। এই ভীষণ প্রতিজ্ঞান জন্য তাঁকে ভীষ্ম বলা হয়। ভীষ্মের কণিষ্ঠ ভ্রাতা বিচিত্রবীর্য রাজত্ব চালান তাঁর ছিল দুই পুত্র – ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু। জ্যেষ্ঠ ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ হওয়ায় পাণ্ডু রাজা হন। কিন্তু পাণ্ডুর অকালমৃত্যুর পর রাজত্ব ধৃতরাষ্ট্রের তত্বাবধানে আসে। সেখান থেকেই শুরু হয় মহাভারতের মহাবিরোধ। কে রাজা হবেন – পাণ্ডুর পুত্র, না ধৃতরাষ্ট্রের ? শুরু হয় হিংসা, ষড়যন্ত্র, কপট দ্যূতক্রীড়া বনবাস ইত্যাদি । কাহিনীর পরিণতি অষ্টাদশদিবসব্যাপী এক সংহারক যুদ্ধ – যাতে ভারতবর্ষের বহু রাজার প্রাণ যায় । মৃত্যু হয় ধৃতরাষ্টের জ্যেষ্ঠপুত্র দুর্যোধন সহ মোট শতপুত্রের। শেষে রাজত্ব পান জ্যেষ্ঠ পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠির। সমস্ত কাহিনীতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মুখ্য চালকের ভূমিকায় থাকেন। এই কাহিনীর আধ্যাত্মিক সারাংশ হল ধর্মের জয় ও অধর্মের নাশ।

চরিত্র সমূহঃ

পাণ্ডব শিবিরঃ পঞ্চপাণ্ডব (যুথিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব), এদের মা কুন্তি (বাবা পাণ্ডু যুদ্ধের বহু পূর্বে বিগত, নকুল, সহদেব-এর মা মাদ্রী সহমৃতা।) স্ত্রী দ্রৌপদী। পুত্র অভিমন্যু, ঘটোত্কচ, শিখণ্ডী, কৃষ্ণ

কৌরব শিবিরঃ দূর্যোধন, দুঃশাসন ইত্যাদি ভাইরা, (পিতা ধৃতরাষ্ট্র রাজধানীতে থেকে সঞ্জয়ের মুখে বর্ণনা শুনছিলেন ও মন্ত্রী বিদুরের সহাতায় রাজ্য চালনা করছিলেন, সেখানে আরো ছিলেন এদের বোন দুঃশলা, মা গান্ধারী), মামা শকুনি। পিতামহ ভীষ্ম, গুরু দ্রোণাচার্য, কৃপাচার্য, কর্ণ, অশ্বথামা, শল্য।

http://www.news39.net/news/130607008

 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন জুন 14, 2013 in হিন্দু ধর্ম

 

অর্জুন

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনিতে এই নামে একাধিক চরিত্র পাওয়া যায়। যেমন–

১. মাহিষ্মতী পুরীতে অর্জুন নামক একজন রাজা ছিলেন। এঁর পিতার নাম ছিল কৃর্তবীর্য। এই কারণে ইনি কার্তবীর্য বা কার্তবীর্যার্জুন নামে পরিচিত ছিলেন।
২. মহাভারতের অন্যতম চরিত্র। এঁর অপরাপর নাম– অরিমর্দন, কপিকেতন, কপিধ্বজ, কিরীটী, কৃষ্ণসখ, কৃষ্ণসারথি, কৌন্তেয়, গাণ্ডিবধন্বা, গাণ্ডিবী, গুড়াকেশ, চিত্রযোধী, জিষ্ণু, তৃতীয় পাণ্ডব, ধনঞ্জয়, পার্থ, ফল্গুন, ফাল্গুনি, বিজয়, বীভৎসু, শব্দবেধী, শব্দভেদী, শুভ্র, শ্বেতবাহ, শ্বেতবাহন, সব্যসাচী।

পাণ্ডু নামক রাজা কিমিন্দম মুনির অভিশাপের (যে কোন নারীর সাথে সঙ্গম করতে গেলে– পাণ্ডু মৃত্যুবরণ করবেন) কারণে স্ত্রীসংগম থেকে বিরত থাকেন। এই কারণে ইনি তাঁর স্ত্রীদ্বয়ের গর্ভে সন্তান লাভ করতে পারলেন না। এরপর ইনি তাঁর স্ত্রী কুন্তী’কে ক্ষেত্রজ সন্তান উৎপাদনের জন্য অন্য পুরুষকে গ্রহণ করতে অনুরোধ করেন। কুন্তী সন্তান কামনায় তিনবার তিনজন দেবতাকে আহ্বান করেছিলেন। শেষবারে তিনি দেবরাজ ইন্দ্রকে আহ্বান করেন। এর ফলে ইন্দ্রের ঔরসে তিনি অর্জুনকে জন্ম দেন। উল্লেখ্য এঁর পূর্বে একই ভাবে কুন্তী পাণ্ডুর অনুরোধে আরও দুটি সন্তান লাভ করেছিলেন। এরা হলেন- ধর্মের ঔরসে যুধিষ্ঠির ও পবনের ঔরসে ভীম। সেই কারণে অর্জুন তৃতীয় পাণ্ডব নামে পরিচিত হয়ে থাকেন। অবশ্য তবে তারও আগে অবিবাহিতা অবস্থায় সূর্যের ঔরসে কুন্তীর গর্ভে জন্মেছিল কর্ণ। কিন্তু তখন তিনি পাণ্ডুর স্ত্রী ছিলেন না বলে- কর্ণ পাণ্ডব হিসাবে স্বীকৃতি পান নি।
অর্জুন প্রথমে কৃপাচার্যের কাছে, পরে দ্রৌণাচার্যের কাছে অন্যান্য পাণ্ডব ও ধৃতরাষ্ট্রের সন্তানদের সাথে অস্ত্রবিদ্যা ও যুদ্ধনীতি শিক্ষা করেন। ইনি দ্রৌণাচার্যের সকল শিষ্যদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। কথিত আছে দ্রৌণাচার্য তাঁর পুত্র অশ্বত্থামা এবং অর্জুনকে বিশেষ যত্নের সাথে অস্ত্রশিক্ষা দান করছিলেন। ধনুর্বিদ্যায় সমকালীন সকল বীরদের মধ্যে ইনি শ্রেষ্ঠ ছিলেন। কৌরবসভায় অস্ত্রশিক্ষা প্রদর্শনকালে দ্রৌণাচার্য সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে ব্রহ্মশির নামক অমোঘ অস্ত্র দান করেন। গন্ধর্বরাজ অঙ্গারপর্ণকে পরাজিত করে- তাঁর কাছ থেকে তিনি চাক্ষুষী বিদ্যা (যার প্রভাবে যে কোন অদৃশ্য বস্তুকে দেখা সম্ভব হতো) লাভ করেন।

দ্রুপদ-কন্যা দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরসভায় অন্যান্য পাণ্ডবদের সাথে ছদ্মবেশে ইনি উপস্থিত হন। এই সভায় একমাত্র তিনিই চক্রমধ্য-মৎস্যকে বিদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সে সূত্রে ইনি দ্রৌপদীকে লাভ করেন। কিন্তু মাতৃ-আজ্ঞায় পঞ্চপাণ্ডব একত্রে তাঁকে বিবাহ করেন। দ্রৌপদীকে নিয়ে যাতে ভ্রাতৃবিরোধ না ঘটে, সে কারণে- নারদ নিয়ম করে দেন যে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, দ্রৌপদী একজন মাত্র পাণ্ডবের স্ত্রী হিসাবে থাকবেন। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অধীকারপ্রাপ্ত পাণ্ডব ব্যতীত অন্য কোন পাণ্ডব দ্রৌপদীকে গ্রহণ করলে বা দ্রৌপদীর সাথে অধিকারপ্রাপ্ত পাণ্ডবের বিহারকালে অন্য পাণ্ডব দর্শন করলে- তাঁকে ১২ বৎসর বনবাসী থাকতে হবে। ঘটনাক্রমে একবার এক ব্রাহ্মণকে সাহায্য করার জন্য- অর্জুন অস্ত্রাগারে প্রবেশ করলে- সেখানে যুধিষ্ঠিরের সাথে দ্রৌপদীকে এক শয্যায় দেখতে পান। এই কারণে ইনি ১২ বৎসর বনবাসের জন্য গৃহত্যাগ করেন। বনবাসকালে ইনি বিভিন্নস্থানে ভ্রমণ করে বেড়ান। এই সময়ে ইনি পরশুরামের সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং তাঁর কাছ থেকে অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা করেন। এই ভ্রমণকালে ইনি নাগকন্যা উলূপী ও মণিপুর-রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদাকে বিবাহ করেন। তাঁর ঔরসে উলূপীর গর্ভে ইরাবান এবং চিত্রাঙ্গদার গর্ভে বভ্রুবাহনের জন্ম হয়।
এরপর অর্জুন দক্ষিণসাগরের দিকে যাত্রা করেন, পঞ্চতীর্থকে কুমীরমুক্ত করেন। উল্লেখ্য এই তীর্থে অভিশপ্ত অপ্সরা বর্গা ও তাঁর চার সখী কুমিররূপে থাকতেন। অর্জুনের স্পর্শে তাঁরা অভিশাপমুক্ত হন। এরপর অর্জুন দ্বারকায় এলে শ্রীকৃষ্ণের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব স্থাপিত হয়। সেখানে শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শে ও সহায়তায় তাঁর বোন সুভদ্রাকে হরণ করে অর্জুন বিবাহ করেন। সুভদ্রার গর্ভে তাঁর অভিমন্যু নামে একটি পুত্র জন্মগ্রহণ করে। ১২ বৎসর পর পুনরায় পাণ্ডবদের সাথে ইনি মিলিত হন। এই সময় দ্রৌপদীর সাথে মিলিত হলে, শ্রুতকর্মা নামক একটি পুত্রসন্তান জন্মে।

এই সময় একদিন অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণ যমুনাতীরে ভ্রমণ করার সময় অগ্নি এসে খাণ্ডববন দগ্ধ করার জন্য অর্জুনের সাহায্য প্রার্থনা করেন। অর্জুন তাকে সাহায্য করতে রাজি হলেন। কিন্তু একই সাথে জানালেন যে, উক্ত বন দগ্ধ করতে গেলে দেবতাদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে। এবং আরও বললেন যে, দেবতাদের সাথে যুদ্ধ করতে গেলে যে ধরনের অস্ত্র প্রয়োজন, সে ধরনের অস্ত্র তাঁর কাছে নেই। অগ্নিদেব তখন তাঁর সখা বরুণকে অনুরোধ করে– তাঁর কাছ থেকে গাণ্ডীবধনু, অক্ষয় তূণীদ্বয় ও কপিধ্বজা রথ এনে দিলেন। এই সকল অস্ত্রের সাহায্যে কৃষ্ণ ও অর্জুন দেবতাদের পরাস্ত করেন। পরে শর নিক্ষেপে অর্জুন খাণ্ডববন দগ্ধ করেন।
এরপর অক্ষক্রীড়ায় যুধিষ্ঠির রাজ্যচ্যুত হলে, অন্যান্য ভাইদের সাথে ইনি ১৩ বৎসরের জন্য বনবাসে যান। এই সময়ে কিরাতবেশী মহাদেব-এর সাথে তাঁর যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে মহাদেব সন্তুষ্ট হয়ে অর্জুনকে পাশুপাত অস্ত্র প্রদান করেন। এরপর ইন্দ্র, বরুণ, কুবের ও যমের সাথে সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং তাঁদের শ্রেষ্ঠ অস্ত্রসমূহ লাভ করেন। এরপর তাঁর পিতা ইন্দ্র তাঁকে স্বর্গে নিয়ে যান। সেখানে ইনি গন্ধর্বরাজ চিত্রসেনের কাছে নৃত্যগীতি শিক্ষা করেন। স্বর্গবাসকালে উর্বশী তাঁকে প্রেম নিবেদন করলে- ইনি তাঁকে মাতৃজ্ঞানে প্রত্যাখ্যান করেন। এই কারণে, উর্বশী তাঁকে এক বৎসর নপুংসক অবস্থায় অতিবাহিত হওয়ার অভিশাপ দেন। এরপর ইনি ইন্দ্রের কাছে অস্ত্রশিক্ষা সমাপ্ত করেন। শিক্ষা শেষে ইনি গুরুদক্ষিণা বাবদ- ইন্দ্রের শত্রু নিবাতকবচ নামক তিন কোটি দানবকে তাদের সমুদ্র মধ্যস্থ দুর্গসহ ধ্বংস করেন এবং পৌলম ও কালকেয় অসুরদের বিনাশ করেন। এই কারণে ইন্দ্র সন্তুষ্ট হয়ে- তাঁকে অভেদ্য দিব্যকবচ, হিরণ্ময়ী মালা, দেবদত্ত শঙ্খ, দিব্যকিরীট, দিব্যবস্ত্র ও ভরণ উপহার দেন। পাঁচ বৎসর ইন্দ্রলোকে থাকার পর ইনি বনে এসে ভাইদের সাথে যোগ দেন।

এরপর দ্বৈতবনে থাকাকালে গন্ধর্বরাজ চিত্রসেন দুর্যোধনকে বন্দী করেন। এই কারণে চিত্রসেনের সাথে অর্জুনের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে অর্জুন চিত্রসেনকে পরাজিত করে দুর্যোধনকে উদ্ধার করেন।

সিন্ধুরাজ দ্রৌপদীকে হরণ করলে, অর্জুন ও ভীম মিলে তাঁকে শাস্তি দেন। এরপর এঁরা মৎস্যরাজ বিরাট-ভবনে উপস্থিত হন। সেখানে উর্বশীর শাপে অর্জুন নপংশুক হয়ে বৃহন্নলা নাম ধারণ করেন। এই বেশে বিরাট-কন্যা উত্তরাকে ইনি নৃত্যগীত শেখানোর দায়িত্ব গ্রহণ করে এক বৎসর অতিবাহিত করেন। পাণ্ডবদের এই অজ্ঞাতবাসের শেষাংশে দুর্যোধন বিরাটরাজের গোধন হরণ করলে বৃহন্নলারূপী অর্জুন কৌরব-সৈন্যদের পরাস্ত করে গোধন উদ্ধার করেন। যুদ্ধ শেষে বিরাটরাজ অর্জুনের সাথে উত্তরার বিবাহ ঠিক করেন। কিন্তু শিষ্যা কন্যার মত বলে ইনি নিজ পুত্র অভিমন্যুর সাথে উত্তরার বিবাহ দেন।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ইনি কৃষ্ণকে উপদেষ্টা ও তাঁর রথের সারথি হিসাবে লাভ করেন। এরপর অর্জুন স্বজনবধে বিমুখ হলে- কৃষ্ণ তাঁকে উপদেশ দিয়ে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করেন। এই উপদেশসমূহের সংকলনই হলো- শ্রীমদ্ভগভদ্গীতা। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ইনি অসংখ্য কৌরব-সৈন্যকে হত্যা করেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের দশম দিনে এঁর শরাঘাতে ভীষ্ম শরশয্যা গ্রহণ করে- ইচ্ছামৃত্য গ্রহণ করেন। এছাড়া যুদ্ধের দ্বাদশ দিনে ভগদত্তকে, চতুর্দশ দিনে অভিমন্যু বধের প্রতিজ্ঞা স্বরূপ জয়দ্রুতকে, পঞ্চদশ দিনে দ্রোণাচার্যকে, ষোড়শ দিনে মগধরাজ দণ্ডধারকে ও সপ্তদশ দিনে কর্ণকে হত্যা করেন।

যুদ্ধজয়ের পর যুধিষ্ঠির অশ্বমেধযজ্ঞের আয়োজন করেন। যজ্ঞের অশ্ব রক্ষার জন্য অর্জুন যাত্রা করে ত্রিগর্ত, প্রাগ্‌জ্যোতিষপুর ও সিন্ধুদেশ জয় করেন। মণিপুরে নিজপুত্র বভ্রুবাহনের সাথে যুদ্ধে ইনি প্রাণ হারালে– অর্জুনের স্ত্রী নাগকন্যা উলূপী নাগলোক থেকে সঞ্জীবনী এনে তাঁকে জীবিত করে তোলেন। এরপর ইনি অশ্বসহ স্বরাজ্যে ফিরে সেন। এরপর শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যু ও যাদবকুলের বিনাশের সংবাদ পেয়ে ইনি দ্বারকায় যান। অর্জুন সেখানকার নারীদের নিয়ে ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে আসার সময়- পথে আভীর দস্যুরা যাদব-নারীদের লুণ্ঠন করে। কৃষ্ণের মৃত্যু ও নিজ দৈবশক্তি হানির ফলে ইনি দস্যুদের বাধা দিতে পারেন নাই।

পাণ্ডবরা অর্জুনের পৌত্র (অভিমন্যুর পুত্র) পরীক্ষিত্কে রাজা করে মহাপ্রস্থানে গমন করেন। পথে লোহিত সাগরের তীরে অগ্নিদেবের অনুরোধে অর্জুন গাণ্ডীবধনু ও অক্ষয় তূণ দুটি পরিত্যাগ করেন। হিমালয় পার হয়ে মহাস্থানের পথে যেতে যেতে- দ্রৌপদী, সহদেব, নকুলের পতনের পর অর্জুনের মৃত্যু হয়। ভীমের প্রশ্নে উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেন, –অর্জুন একদিনে শত্রু-সৈন্য বিনষ্ট করবার প্রতিজ্ঞা করে তা রক্ষা করতে অসমর্থ হয়েছিলেন এবং অন্যান্য ধনুর্ধরদের অবজ্ঞা করতেন বলেই এঁর পতন হয়েছে।

http://onushilon.org/myth/hindu/arj.htm

 
মন্তব্য দিন

Posted by চালু করুন জুন 8, 2013 in হিন্দু ধর্ম

 
 
Follow

Get every new post delivered to your Inbox.